১৫ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ সন্ধ্যা ৬:৫৩

সূর্যমুখী চাষাবাদে মেনে চলুন সঠিক নিয়ম

রিপোর্টার নাম
  • আপডেট টাইমঃ সোমবার, এপ্রিল ২২, ২০২৪,
  • 457 সংবাদটি পঠিক হয়েছে

তেলজাতীয় অর্থকরী ফসল সূর্যমুখী। এটি সঠিক চাষে লাভবান হওয়া যায়। আজকের আয়োজন এর নানা দিক নিয়ে।

সূর্যমুখী শুধু ফুলই নয়, এটি তেলজাতীয় একটি ফসলও বটে। বাংলাদেশে এর উৎপাদন অন্যান্য দেশের তুলনায় কম। তবে ধীরে ধীরে এটি জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।
সূর্যমুখীর গাছ লবণাক্ত জমির উপযোগী। তাই সব জায়গায় এর চাষ সম্ভব নয়। বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের মাটি লবণাক্ত। এখানে চাষের জন্য উপযুক্ত। সঠিক চাষ পদ্ধতি অবলম্বন করতে পারলে সূর্যমুখী চাষে অধিক লাভবান হতে পারবেন চাষিরা। জেনে নিতে পারেন এর চাষাবাদ সম্পর্কে:

জলবায়ু: সূর্যমুখী আলো নিরপেক্ষ একটি ফসল, তাই সারা বছর চাষ করা যায়। বীজের অঙ্কুরোদগম ও চারা গজানোর পর কিছুদিন ঠাণ্ডা আবহাওয়া প্রয়োজন। দৈহিক বৃদ্ধির সময় হালকা বৃষ্টিপাত হলে ভালো। এরপর পুষ্পায়নের জন্য কিছুটা উষ্ণ আবহাওয়া দরকার। এছাড়া ভালো ফলনের জন্য বীজ পাকার সময় মেঘমুক্ত আকাশ খুবই উপযোগী।

জাত ও জমি নির্বাচন: সূর্যমুখীর দুটি জাতের মধ্যে কিরণী (ডিএস ১) জাতটি চাষের জন্য বেছে নিতে পারেন। সূর্যমুখী সাধারণত লবণাক্ত মাটিতে ভালো জন্মে। তবে সঠিক পরিচর্যায় দোআঁশ ও বেলে দোআঁশ মাটিতেও উৎপন্ন করা সম্ভব। মাঝারি নিচু জমি এ ফসল চাষের উপযুক্ত। অত্যন্ত নিচু জমি বা যেখানে পানি জমে থাকে, এমন স্থানে চাষ করা উচিত নয়। মাটিতে আর্দ্রতা বা রসের পরিমাণ বেশি হলে বীজ বোনার পর তা পচে যেতে পারে।

সূর্যমুখী বীজ বপনের সময়: সব মৌসুমেই এটি চাষ করা যায় ঠিকই, তবে কয়েকটি বিষয় মেনে চলা উচিত। রবি মৌসুমে অগ্রহায়ণে অর্থাৎ নভেম্বর থেকে ডিসেম্বরে চাষ করা যায়। খরিপ ১ মৌসুমের জন্য বৈশাখে, অর্থাৎ এপ্রিল থেকে মে এবং খরিপ ২ মৌসুমের জন্য ভাদ্রে, অর্থাৎ আগস্ট থেকে সেপ্টেম্বরে বীজ বপন করা হয়।

জমি তৈরি: সূর্যমুখী গভীরমূলী ফসল। তাই জমি ভালোভাবে চাষ করতে হবে। জমিতে তিন থেকে চারটি আড়াআড়ি চাষ দেওয়ার পরে মই দিয়ে মাটি ঝুরঝুরে করে নিতে হবে। চাষকৃত জমি ছোট ছোট প্লটে ভাগ করে নেওয়া যেতে পারে। এতে বীজ বপনের পর পরিচর্যা করতে সুবিধে হবে।

বপন পদ্ধতি: বীজ বপন ও শোধনের আগে চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা পানিতে ভিজিয়ে রাখতে হবে। এতে বীজের ত্বক নরম হবে। অঙ্কুরোদগম ভালো হবে। সূর্যমুখীর বীজ দুই থেকে তিন সেন্টিমিটার গভীরে বপন করতে হয়। সারিতে বপন করলে ভালো ফলন পাওয়া যাবে। সারি থেকে সারির দূরত্ব ৫০ সেন্টিমিটার ও গাছ থেকে গাছের দূরত্ব ২৫ সেন্টিমিটার হতে হবে। প্রতিটি স্থানে তিন থেকে চারটি বীজ বপন করতে হয়। চারা গজানোর পর সুস্থ ও সবল চারা রেখে বাকিগুলো তুলে ফেলতে হবে।

পরিচর্যা ও ফসল সংগ্রহ: সূর্যমুখীর পরিচর্যায় চাষিদের সচেতন হওয়া জরুরি। বিশেষ করে বীজ থেকে চারা গজানোর পর সার দেওয়ার সময় সতর্ক থাকতে হবে।
বীজ বপনের পর যখন সূর্যমুখী পুষ্ট হওয়া শুরু করে, তখন জমিতে বিভিন্ন পাখির উপদ্রব শুরু হয়। ভোর ও সূর্যাস্তের আগে পাখির আক্রমণ বেশি হয়। এদের আক্রমণ থেকে বাঁচতে বাঁশের চোঙ বা ঘণ্টা বাজিয়ে অথবা জমির মাঝখানে কেরোসিনের টিন উঁচু করে বেঁধে দিতে হবে। এতে দড়ির সাহায্য দূর থেকে টেনে শব্দ করলে পাখি জমিতে বসতে পারে না।

সূর্যমুখী জমিতে বথুয়া, দূর্বা, থানকুনি প্রভৃতি জন্মে। চারা গজানোর পর দুই মাস পর্যন্ত জমিকে আগাছামুক্ত রাখতে হবে। আগাছা পরিষ্কার করার সময় প্রতিটি স্থান বা গোছায় একটি স্বাস্থ্যবান চারা রেখে বাকি চারা তুলে ফেলতে হবে।

সেচ ও নিষ্কাশন: খরিপ মৌসুমে সূর্যমুখীর জন্য সাধারণত কোনো সেচের প্রয়োজন পড়ে না। তবে রবি মৌসুমে ভালো ফলন পাওয়ার জন্য দুই থেকে তিনবার সেচ দিতে হবে। প্রথম সেচ চারা গজানোর এক মাস পর, দ্বিতীয় সেচ দেড় মাস ও তৃতীয় সেচ আড়াই মাস পর দিতে হয়। কোনো কারণে জমিতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হলে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করতে হবে। দুই সারির মাঝের মাটি তুলে গাছের গোড়ায় দিতে হয়। এতে গাছের গোড়া মজবুত হয়। ফলে ঝড়-বৃষ্টিতে সহজে গাছ হেলে পড়ে না।

ফসল সংগ্রহ ও সংরক্ষণ: পরিপক্ব হলে গাছের পাতা হলদে হয়ে আসে, পুষ্পস্তবকসহ গাছের মাথা নুয়ে পড়ে। দানাগুলো পুষ্ট, শক্ত ও কালো রং ধারণ করে। এ সময় কাস্তে দিয়ে গাছ থেকে পুষ্পস্তবকগুলো কেটে দু-এক দিন রোদে শুকাতে দিতে হবে। এরপর লাঠির সাহায্যে আঘাত করে বীজগুলো আলাদা করা হয়। কুলা দিয়ে বীজ ভালোভাবে পরিষ্কার করার পর রোদে শুকাতে দিন। অন্তত কমপক্ষে দু-তিন দিন রোদে শুকানোর পরে সংরক্ষণ করতে হবে। বীজ ছাড়ানোর পর পুষ্পস্তবকের অবশিষ্ট অংশ গোখাদ্য ও জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে।

রোগ ও পোকামাকড় দমন: সূর্যমুখীও নানা ধরনের রোগে আক্রান্ত হয়ে থাকে। অনেক পোকামাকড় এর ক্ষতি করে। এতে ফলন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই চাষিদের সূর্যমুখীর রোগবালাই ও এর দমন ব্যবস্থা সম্পর্কে জানা প্রয়োজন।

পাতা ঝলসানো রোগ: অলটারনারিয়া হেলিয়াস্থি নামক ছত্রাকের আক্রমণে সূর্যমুখীর এ রোগটি হয়ে থাকে। এর আক্রমণে প্রথম দিকে পাতায় ধূসর বা গাঢ় বাদামি বর্ণের অসম আকৃতির দাগ পড়ে। পরে দাগ মিশে গিয়ে বড় দাগের সৃষ্টি হয়। অবশেষে সম্পূর্ণ পাতা ঝলসে যায়।
দমনের জন্য রোগসহনশীল কিরণী জাত চাষ করতে হবে। রোগাক্রান্ত হলে সঙ্গে সঙ্গে ছত্রাকনাশক ওষুধ পানিতে মিশিয়ে ১০ দিন পরপর দুই থেকে তিনবার জমিতে দিতে হবে। ফসল কাটার পর গাছের পরিত্যক্ত অংশ নষ্ট করলে বা পুড়িয়ে ফেললে এ রোগের উৎস নষ্ট হয়ে যায়।

শেকড়পচা রোগ: সাধারণত স্কেলেরোশিয়াম রলফসি নামক ছত্রাকের কারণে এ রোগ হয়ে থাকে। আক্রান্ত গাছের গোড়া সাদা তুলার মতো হয়। তখন গোলাকার দানার মতো দেখায়। প্রথমে গাছ কিছুটা নেতিয়ে পড়ে। কয়েক দিনের মধ্যে পুরো গাছ ঢলে পড়ে ও শুকিয়ে মারা যায়।

কৃষি অধিদফতরের পরামর্শ অনুযায়ী ছত্রাকনাশক ওষুধ দিয়ে বীজ শোধনের মাধ্যমে রোগের বিস্তার রোধ করা সম্ভব। এছাড়া জমি ভেজা থাকলে এ ছত্রাক বাঁচতে পারে না। সুতরাং রোগ আক্রমণের পর জমিতে প্লাবন সেচ দিয়ে এর প্রকোপ কমানো যায়।

এই পোস্টটি শেয়ার করুন...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ ...
© All rights reserved © 2022
Developed By Engineerbd.net
EngineerBD-Jowfhowo