নিজস্ব প্রতিবেদক: যেকোন দপ্তরের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তি-বিশেষ যদি মানবিক ও নৈতিকতা বোধসম্পন্ন ব্যক্তিত্ব হয় তবে সে দপ্তরটি সাফল্যের চুড়ায় পৌছে। সমাজ ও দেশের কাছেও অস্তিত্ব জানান দিতে সক্ষম হয়। গৌরব ও সাফল্যে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য হাসিলও সহজতর হয়। তবে ভিন্ন চিত্র ঘটলেই বাধে বিপত্তি। সেক্ষেত্রে শুধু সে প্রতিষ্ঠানটিই ক্ষতিগ্রস্ত হয়না নেতিবাচক প্রভাব পড়ে সমাজ ও শীর্ষ মহলেও । যা পুরো ব্যবস্থাপনাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে। সেই সাথে অস্তিত্ব সংকটেরও সম্মুখীন হতে হয়। যা নেতিবাচক ফলাফল বয়ে আনে সচেতন মহলে। অন্যদিকে অভিযুক্ত ব্যক্তি নানা অযুহাত দেখিয়ে নিজের স্বার্থ সিদ্ধি করে যাচ্ছেন পুরোদমে।
এমনই এক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হচ্ছে বরিশালের সিভিল সার্জন কার্যালয়। নানা অভিযোগে সরকারী এ প্রতিষ্ঠানটির ভাবমূর্তি দাঁড়িয়েছে অপরাধের কাঠগড়ায়। আর এর মুলহোতা হিসেবে রয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির স্টেনো মোঃ সেলিম হোসেন।
অভিযোগে জানা গেছে, দীর্ঘ ২৯ বছর ধরেই এই দপ্তরটির স্টেনোটাইপিস্ট পদে কর্মরত তিনি। দীর্ঘ এ সময়ে নিজের আধিপত্য বিস্তার করে এক কথায় হয়েছেন আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ। দপ্তরটির খোদ সিভিল সার্জন তার মর্জিনুযায়ী নির্দেশিত পথে নানা কার্যক্রম সম্পন্ন করছেন।
যদিও তার দায়িত্ব ভিন্ন। তথাপি নিজের একচ্ছত্র আধিপত্র বিস্তার করেছেন পুরো দপ্তরটিকে ঘিরে। আর এতে ঐ প্রতিষ্ঠানের একাধিক কর্মকর্তা – কর্মচারীরা হতাশাও প্রকাশ করেছেন।
সম্প্রতি দুর্নীতিবাজ এই স্টেনোর বিরুদ্বে বে-আইনী ভাবে পদোন্নতি গ্রহণে সরকারী অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ এনে তা আদায়ে বরিশালের হিসাব নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ে একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন সিভিল সার্জন অফিসের এমএলএসএস মোঃ মিজানুর রহমান, সদর হাসপাতালের এমএলএসএস আমিন আলী শেখ ও আ,ন,ম বজলুর রশিদ (প্রাক্তন প্রধান সহকারী) ।
অভিযোগে তারা উল্লেখ করেছেন, মোঃ সেলিম হোসেন ০৯/০৬/১৯৮৮ সালে ৭০০-১৪১৫/- বেতন স্কেলে স্বাস্থ্য সহকারী পদে যোগদান করেন। পরবর্তীতে বিভাগীয় উপ-পরিচালক স্বাস্থ্য, খুলনা বিভাগে নিয়োগ বিধি পরিপন্থী পদে নিম্নমান সহকারী কাম মুদ্রাক্ষরিক পদে পদোন্নতি প্রদান করলে তিনি ৩১/১২/১৯৯৯ তারিখে নিম্নমান সহকারী কাম মুদ্রাক্ষরিক পদে যোগদান করে উক্ত পদে ২টি অতিরিক্ত ইনক্রিমেন্ট গ্রহন করেন। যা সম্পূর্ন বেআইনী ।
পুনরায় পরিচালক(স্বাস্থ্য),বরিশাল বিভাগ, বরিশাল উক্ত নিয়োগ বিধি পরিপন্থি পদে পদায়নকৃত কর্মচারীকে পুনরায় একইভাবে নিয়োগ বিধি পরিপন্থি পদে উচ্চমান ছেলে নিম্নমান সহকারী হতে নিজ বেতনে ষ্টেনোটাইপিষ্ট হিসাবে পদোন্নতি প্রদান করেন এবং তিনি ষ্টেনোটাইপিষ্ট হিসাবে ২৫/০৬/১৯৯৫ তারিখে পিরোজপুর সিভিল সার্জন অফিসে যোগদান করেন।
তিনি স্টেনো টাইপিষ্ট হিসাবে নিয়োগ বিধি পরিপন্থী পদে পদোন্নতি নিয়ে ২টি পে-স্কেলের উর্দ্ধে ২২৫০-৪৭৩৫ টাকা বেতন স্কেলে সিলেকশন গ্রেডে বেতন নির্ধারন করে ৩টি অতিরিক্ত ইনক্রিমেন্ট এর অর্থিক সুবিধা গ্রহন করে সরকারের অনেক টাকার অর্থিক ক্ষতি সাধন করেছেন।
এছাড়াও তিনি কর্তৃপক্ষকে ভ্রান্ত পহ্নায় নিয়োগ বিধি পরিপন্থি পদে পদোন্নতি নিয়ে অবৈধভাবে ষ্টেনোগ্রাফার হিসাবে সিঃ গ্রেড নিয়েছেন। গত ০৮/১২/২০১৫ তারিখে বছর পূর্তিতে ৩ টি অতিরিক্ত টাইম খেল গ্রহন করেন।
এতে সরকারের লক্ষ লক্ষ টাকা আর্থিক ক্ষতি সাধিত হয়। প্রতিনিয়ত পদোন্নতির বিধি পরিপহ্নি এই অবৈধ পদোন্নতি সরকারের আর্থিক ক্ষতি এবং দীর্ঘ ঊনত্রিশ বছর বরিশাল সিভিল সার্জন অফিসে একই ষ্টেশনে চাকুরী করছেন।
এতে নিজের আধিপত্য বিস্তার করে স্বাস্থ্য সেবামুলক এ প্রতিষ্ঠানটিকে অনিয়ম ও স্বেচ্ছাচারিতার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করেছেন।
অভিযোগকারীরা আরও উল্লেখ করেন, স্টেনো সেলিম অফিসে কর্মচারীদের সাথে খারাপ আচরণের ফলে তার বিরুদ্ধে ১৬/০৯/২০১৮ তারিখে বিভিন্ন পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশিত হয়। সে আলোকে বিভাগী পরিচালক (স্বাস্থ্য), বরিশাল বিভাগ এর কার্যালয় হতে বিগত ০১/১১/২০১৮ তারিখ তদন্ত কমিটি গঠিত হয়। প্রায় ১৭ বছর পূর্বে তাকে প্রশাসনিক কারনে বদলী করা হয়েছিল। তবে সে হাইকোর্টে রিট করে অদ্যাবধি একই ষ্টেশনে নিজের অদৃশ্য দাপটে ঊনত্রিশ বছর চাকুরীরত রয়েছেন।
অভিযোগকারীরা স্টেনো সেলিমের বিরুদ্বে নিয়োগ বিধি পরিপন্থি পদে ২৫/১২/১৯৯২ তারিখ হতে পদোন্নতি গ্রহন করে ২টি অগ্রীম ইনক্রিমেন্ট সিলেকশন গ্রেডে ৩ টি অতিরিক্ত ইনক্রিমেন্ট এবং ৩ টি অতিরিক্ত টাইম স্কেল গ্রহন করে সরকারের লক্ষ লক্ষ টাকা আর্থিক ক্ষতি করছেন এমন অভিযোগ তুলেছেন। একইসাথে ঐ অর্থ আদায়যোগ্য বলে উল্লেখ করে টাকা আদায়ের বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবী জানান।
এদিকে এর আগে স্টেনো সেলিমের বিরুদ্বে নানা অনিয়মের অভিযোগ এনে’ দুর্নীতি তদন্তে ফেঁসে যেতে পারেন বরিশাল সিভিল সার্জনের ষ্টেনো সেলিম’ শিরোনামে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়।
জানা গেছে, দুর্নীতি ও বিভিন্ন ডায়াগণস্টিক থেকে মাসওয়ারা গ্রহনের অভিযোগ তদন্তের জন্য ১৯-১১- ২০১৯ তারিখ তৎকালীন ঢাকা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সহকারি পরিচালক (শৃঙ্খলা-২) ডা: হেলিশ রঞ্জন সরকার ও প্রশাসনিক কর্মকর্তা সাজেমান আলীর একটি তদন্ত টিম বরিশাল সিভিল সার্জন অফিসে এসেছিলেন। তদন্তকারী দল দুর্নীতির কোন তথ্য যাতে না পায়, সে জন্য তৎকালীন সিভিল সার্জন ও দুর্নীতিবাজ সেলিমের যোগসাজসে আগেরদিন সন্ধ্যায় অফিসের কর্মকর্তা গোপন বৈঠকেও বসেন। সেখানে সিভিল সার্জন অফিসের তৎকালীন প্রশাসনিক কর্মকর্তা ফরিদ উদ্দিন, প্রধান সহকারি কর্মকর্তা জলিলুর রহমান, অফিস সহকারি জহিরুল হক খান, নজরুল, সিদ্দিক, রফিকুল ইসলাম ও ইপিআই টেকনেশিয়ান লোকমান হোসেন ও অভিযুক্ত সেলিমসহ প্রায় ১০/১২ জন উপস্থিত ছিলেন।
ঐ বিষয়ে তৎকালীন তদন্তকারী কর্মকর্তা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সহকারি পরিচালক (শৃঙ্খলা-২) ডাঃ হেলিশ রঞ্জন সরকার জানিয়েছিলেন ,বরিশাল সিভিল সার্জন কার্যালয়ের দুর্নীতির কথা অনেক আগ থেকেই শুনে আসছি।
এ বিষয়ে বরিশাল সিভিল সার্জন অফিসের অভিযুক্ত স্টেনোটাইপিস্ট মোঃ সেলিম হোসেন জানান,আমাকে হেয় ও প্রতিপন্ন করার জন্য একটি কু-চক্র মহল আমার পেছনে উঠে পড়ে লেগেছে। আমার বিরুদ্ধে বে-নামে অভিযোগ করে আমাকে হয়রানি করছে। এর আগে আমার বিরুদ্ধে তদন্ত কমিটি হয়েছিলো কিন্তু তারা তদন্ত করে সত্যতা পাননি।
বরিশাল সিভিল সার্জন ডাঃ মারিয়া হাসান বলেন, আমি যোগদানের পর থেকে এখন পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে কেউ লিখত অভিযোগ দেয়নি। অভিযোগ দিলে আমার ঊর্ধতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে ব্যবস্থা নেয়া হবে। এ ব্যাপারে বরিশাল বিভাগীয় পরিচালক ডা: শ্যামল কৃঞ্জ মন্ডল জানান এ বিষয়ে আমার কাছে কোন লিখিত অভিযোগ আসেনি।তাছাড়া ওখানে তো একজন দক্ষ সিভিল সার্জন কর্মকর্তা রয়েছেন।সে যদি আমার কাছে কোন সাহায়তা চান তাহলে অবশ্যই সহায়তা করবো।