নিজস্ব প্রতিবেদক
দক্ষিণাঞ্চলের সর্ববৃহৎ সরকারী চিকিৎসা সেবা দানকারী প্রতিষ্ঠান বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। দূর-দুরান্ত থেকে ছুটে আসা রোগীদের আস্থার প্রতীক এটি। নানা রোগে আক্রান্তরা সু-চিকিৎসা প্রাপ্তিতে এ হাসপাতালমুখী হচ্ছেন। এই হাসপাতালের রোগীর ধারণ ক্ষমতার চেয়ে দ্বিগুন রোগী ভর্তি হওয়ায় নতুন ভবনও চালু করেছে কর্তৃপক্ষ। তবে তীক্ষ্ণ নজরদারীর অভাবে ছুটে আসা রোগীরা বিভিন্ন সময়ে যথাযথ চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হন। হাসপাতালের সার্বিক ব্যবস্থাপনার নড়বড়ে হওয়ায় প্রায়সই হয়রানীরও শিকার হতে হয় অসহায় রোগীদের।
এছাড়া চিকিৎসক সংকটও প্রকট। অধিকাংশ ইন্টার্ন চিকিৎসকদের দিয়ে প্রদান করা হয় সেবা। আর এরই মধ্যে গুরুত্বপুর্ণ একটি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপককে পদোন্নতি দিয়ে পার্শবর্তী পটুয়াখালী জেলায় বদলীতে যেন হতাশার ছাপ নেমে এসেছে রোগীদের মাঝে।
জানা গেছে, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যান মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য সেবা বিভাগ থেকে জারি করা এক বিজ্ঞপ্তিতে দেখা গেছে, শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কার্ডিওলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডাঃ মোঃ সালেহ উদ্দিন কে পদোন্নতি দিয়ে পটুয়াখালী মেডিকেল কলেজে যোগদানের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব সারমিন সুলতানার স্বাক্ষরিত ঐ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়।
বদলীর বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর শেবাচিম হাসপাতালের রোগীদের মাঝে বইছে হতাশার ছাপ। একাধিক রোগী জানিয়েছেন, এ হাসপাতালের কার্ডিওলজি বিভাগের একজন অভিজ্ঞ ও আন্তরিক চিকিৎসক সালেহ উদ্দিন স্যার। তার পরামর্শ অনুযায়ী আমরা অনেকেই সুস্থ হয়েছি।
হাসপাতালটিতে বর্তমানে তার চেয়ে অভিজ্ঞ কোন চিকিৎসক নেই। তার কর্মস্থল এখানেই রাখার দাবি জানিয়ে রোগীরা মন্ত্রণালয়ের সুদৃষ্টি কামনা করেছেন।
এদিকে জানা গেছে, কার্ডিওলজি বিভাগের অন্য দুইজন চিকিৎসক রয়েছেন তারা হলেন, অসীম কুমার ও শরাফাত নুরুল ইসলাম।
হৃদরোগে আক্রান্তদের এনজিওগ্রাম ও হার্টে রিং সংযোজনের প্রয়োজন হয়। কিন্ত তা ডাঃ সালেহ উদ্দিন ছাড়া তারা পারদর্শী নন। এক্ষেত্রে জটিল এসব রোগের ক্ষেত্রে একজন অভিজ্ঞ চিকিৎসককে অন্যত্র বদলীতে সচেতন মহলেও নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
তাদের দাবী, দক্ষিণাঞ্চলের সর্ববৃহৎ সরকারী চিকিৎসা সেবা দানকারী এ প্রতিষ্ঠানটিতে অনেক জটিল রোগীরা সেবা নিচ্ছেন। অনেকেই আবার আক্রান্ত হয়ে বড় চিকিৎসকের শরনাপন্ন হয়ে সুস্থ হওয়ার প্রত্যাশায় ভর্তি হচ্ছেন। এক্ষেত্রে শত শত রোগীর জন্য এমন একজন অভিজ্ঞ চিকিৎসককে অন্যত্র বদলী বিষয়টি সংশ্লিস্ট মন্ত্রণালয়ের ভেবে দেখা উচিত বলে মনে করছেন তারা।
এদিকে জানা গেছে, পদায়নকৃত পটুয়াখালী মেডিকেল কলেজে নেই কোন কার্ডিওলজি বিভাগও। আরও জানা গেছে, বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে হৃদ রোগ বিভাগের ২০১৩ সালের দিকে প্রায় ৯ কোটি টাকা মূল্যের একটি এনজিওগ্রাম মেশিন সরবরাহ করা হয়। মেশিনটি পরিচালনার জন্য এই বিভাগে কোন চিকিৎসক না থাকায় দীর্ঘ দিন মেশিনটি কোন রোগীর উপকারে আসে নি। অতঃপর ইন্টারভেনশনাল হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. এম সালেহ উদ্দীন কে বরিশালে পদায়ন করা হলে তিনি বক্সবন্দি এনজিওগ্রাম মেশিনটির কার্যক্রম শুরু করেন। ২০১৪ সালের ২৪ জুলাই থেকে তিনি রোগীদের করনারি এনজিও প্লাস্টি (হার্টে রিং) বাসানো শুরু করেন। সেই থেকেই নিয়োমত ভাবে রোগীদের করনারি এনজিও প্লাস্টি (হার্টে রিং) বাসানো কার্যক্রম এই হাসপাতালেই সম্ভব হয়। যা বরিশালের ইতিহাসে প্রথম। কেননা ২০১৪ সালের আগে করনারি এনজিও প্লাস্টি (হার্টে রিং) করানো জন্য রোগীদের রাজধানীতে যেতে হতো। ইন্টারভেনশনাল হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. এম সালেহ উদ্দীন করনারি এনজিও প্লাস্টি (হার্টে রিং) বসানো পাশাপাশি রোগীর হৃৎপিণ্ডে (হার্টে) ডুয়েল চেম্বার পেসমেকার প্রতিস্থাপনও করতেন এবং কিডনীতে রিং সংযোজন করেন। তবে ২০২১ সালের দিকে মেশিনটি সামান্য নস্ট হওয়ায় রোগীদের অসুবিধায় পড়তে হয়। পরবর্তিতে হাসপাতালের বর্তমান পরিচালক ডাঃ এইচ এম সাইফুল ইসলামের সহযোগীতায় মেশিনটি আবারো চালু করতে সক্ষম হন ইন্টারভেনশনাল হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. এম সালেহ উদ্দীন। দীর্ঘদিন বরিশাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে থেকে হাজার হাজার গরিব রোগীদের পাশে দাড়ানো ডা. এম সালেহ উদ্দীনকে পটুয়াখালীতে বদলী করার হতাস এ অঞ্চলের রোগীরা।
এদিকে শুধু চিকিৎসা সেবায়ও সমস্যা নয় , প্রভাব পড়বে মেডিকেল কলেজ শিক্ষার্থীদের মাঝেও । ডা. এম সালেহ উদ্দীন মেডিকেল কলেজের সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে শিক্ষার্থীদের এই গুরুত্বপুর্ণ বিভাগের বিষয়ে পাঠদান করাতেন তিনি। তার উপস্থিতিতে শিক্ষার্থীরা পরিপুর্ণভাবে শিক্ষাগ্রহণ করতে পারতেন। তার এমন বদলীতে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন শিক্ষার্থীও।
একাধিক শিক্ষার্থী জানান, ডাঃ সালেহ উদ্দীন স্যার খুব অভিজ্ঞ। আমরা তার পাঠদানের মধ্য দিয়ে সঠিক ও নির্ভুলভাবে শিখতে পারতাম। কিন্ত তার এমন বদলীতে আমাদের গুরুত্বপুর্ণ এ বিভাগের শিক্ষায় ব্যাপক প্রভাব পড়বে। মুলত এজন্য আমাদের ক্ষতিসাধণ হবে। পদায়ন ও বদলীর বিষয়ে ডাঃ মো সালেহ উদ্দিন জানান, সংশ্লিস্ট মন্ত্রণালয় থেকে প্রাপ্ত তথ্য থেকে বদলীর বিষয়ে নিশ্চিত হয়েছি।
সরকারী চিকিৎসকের বদলী যেকোন সময়েই হতে পারে। এটা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা। আমরা সেটি বাস্তবায়নে বাধ্য। তবে শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কার্ডিওলজি বিভাগে অনেক মুমুর্স রোগী ভর্তি। তারা হার্টে নানান সমস্যা নিয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন। অনেকের এনজিওগ্রাম আবার রিং ও স্থাপন করতে হয়। সেক্ষেত্রে এমন জটিল অপারেশন আমি ছাড়া অন্য কেউ করতেন না। সেক্ষেত্রে শেবাচিমের রোগীদের একজন অভিজ্ঞ ও দক্ষ চিকিৎসক প্রয়োজন।
হাসপাতালের পরিচালক ডা. এইচ এম সাইফুল ইসলাম বলেন, ডা. এম সালেহ উদ্দীনের মতো বিশেষজ্ঞ চিকিৎসককে বদলীতে গুরুত্বর্পুণ কার্ডিওলোজী বিভাগের চিকিৎসা সেবায় প্রভাব পড়বে। এমনিতেইএ বিভাগে চিকিৎসক সংকট। তিনি এখানে নিয়োমিত এনজিও প্লাস্টি (হার্টে রিং) ও ডুয়েল চেম্বার পেসমেকার প্রতিস্থাপন করতেন। তার অনুপস্থিতিতে এ সেবাটি বিঘ্নিত হবে। ক্ষতিগ্রস্ত হবে রোগীরা। তাকে পদোন্নতি দিয়ে শেবাচিম হাসপাতালে রাখার জন্য মন্ত্রনায়লের কাছে দাবী জানিয়েছি।