কোরবানি আমাদের কী শিক্ষা দেয়?
আরবি শব্দ ‘কুরব’ থেকে কোরবানি শব্দটি এসেছে। ‘কুরব’ অর্থ নিকটে। কোরবানি অর্থ হলো নৈকট্য লাভ করা। তাই কোরবানির মূল শিক্ষাই হলো আল্লাহ তাআলার নৈকট্য লাভ করা।
কোরবানি আমাদের শিক্ষা দেয় কীভাবে আল্লাহ তাআলার কাছের বান্দা হওয়া যায়।
কোরবানির মাধ্যমে নৈকট্য লাভ করার জন্য অবশ্যই আমাদেরকে এর ইতিহাসের দিকে নজর দিতে হবে। হাবিল-কাবিলের কোরবানি ও ইবরাহিম (আ.)-এর কোরবানি এর মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।
ঈদ আসলে সামাজিক প্রথা ও লোক দেখানোর জন্য পশু জবাই করলেই আল্লাহ তাআলার নৈকট্য লাভ করা যায় না। এর জন্য বেশকিছু বিষয়ের প্রতি নজর দিতে হয়। যা অন্যান্য আমলের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। আমরা সেসব বিষয় থেকে শিক্ষা নিতে পারি।
নিয়তের শুদ্ধতা
নিয়তের শুদ্ধতা ও পরিপক্বতা আমল কবুলের গুরুত্বপূর্ণ শর্ত, যা কোরবানির অন্যতম শিক্ষা। লোক দেখানো বা নিছক গোশত খেতে কোরবানি দিলে কোরবানি কবুল হয় না। আল্লাহ বলেন,
আপনি বলুন, আমার নামাজ, আমার কোরবানি, আমার জীবন এবং মরণ জগৎস্রষ্টা আল্লাহর জন্য (সুরা আনআম ১৬২)।
ইবাদত শুধু আল্লাহর জন্যই হওয়া উচিত। কোনো ইবাদতে যদি মানুষ দেখানো মানসিকতা থাকে তাহলে তা অনর্থক, সাওয়াবহীন হয়ে যায়। হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ বলেন,
যে ব্যক্তি আমার ইবাদত করল এবং তাতে আমার সঙ্গে অন্যকে শরিক করল (মানুষ দেখানোর নিয়তে করল), আমি তাকে এবং তার ইবাদতকে ছেড়ে দেই (মুসলিম ২৯৮৫)।
তাকওয়ার শিক্ষা
কোরবানি থেকে আমরা তাকওয়ার শিক্ষা পাই। মোমিনের জীবনে তাকওয়ার গুরুত্ব অপরিসীম। আল্লাহভীতি ছাড়া সবকিছু গুরুত্বহীন। তাকওয়া-আল্লাহভীতি ব্যতীত কোটি টাকা খরচ করে কোরবানি দিলেও তাতে কোনো লাভ হবে না। কারণ, আল্লাহ বান্দার তাকওয়া দেখেন। পশুর মোটাতাজা আর গোস্ত দেখেন না।
আল্লাহতায়ালার কাছে তার (কোরবানির) গোস্ত ও রক্ত পৌঁছে না, তবে তাঁর কাছে তোমাদের তাকওয়া পৌঁছে। (সুরা হজ : ৩৭)।
ত্যাগ করার মানসিকতা
কোরবানি আমাদেরকে আল্লাহ তাআলার জন্য আত্মত্যাগ ও নিজ স্বার্থ বিসর্জনের শিক্ষা দেয়। আল্লাহ তাআলার জন্য নিজ জীবন বা সন্তানের জীবন উৎসর্গ করতে উৎসাহ জোগায়। যেমনটা করেছিলেন ইবরাহিম (আ.)। আল্লাহর বিধানের সামনে নিজ সন্তানকে কোরবান করতে কুণ্ঠাবোধ করেননি তিনি। তাদের এই ঘটনা আমাদেরকে শেখায় যে, আল্লাহ তাআলার আদেশকে সকল স্বার্থ এবং সম্পর্কের ওপরে রাখতে হবে এবং আল্লাহ তাআলার ভালোবাসার জন্য অন্য সব ভালোবাসা বিসর্জন দিতে সদাপ্রস্তুত থাকতে হবে।
সাধ্যের সবটুকু সমর্পণ
কোরবানির ইতিহাস আমাদের জানান দেয় যে, আল্লাহকে পেতে হলে সাধ্যের সবটুকু তার জন্য উৎসর্গ করতে হবে। তাহলেই আল্লাহর পূর্ণ ভালোবাসা পাওয়া যাবে। ইবরাহিম (আ.) তার সাধ্যের সর্বোচ্চটুকু দিয়েছেন নিজ সন্তানকে কোরবানি দিয়ে। বদলায় আল্লাহ তাকে আপন বন্ধু বলে ঘোষণা দিয়েছেন। আজকেও যদি আমরা আল্লাহ প্রেমে সব উজাড় করে দিতে পারি, তাহলে আমরাও আল্লাহর প্রিয়জন বলে বিবেচিত হব।
নিজের প্রিয় বস্তুকে উৎসর্গ করা
দুনিয়ায় যত নবী এসেছেন, সবাই আল্লাহ প্রেমে নিজেদের প্রিয় বস্তু উৎসর্গ করেছেন। ইবরাহিম (আ.) আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য আপন সস্তান ও স্ত্রীকে জনমানবহীন ধু-ধু প্রান্তরে রেখে এসেছিলেন। তার সন্তুষ্টির জন্য-ই প্রাণাধিক প্রিয় সন্তানকে কোরবানি করতে ইতস্ততবোধ করেননি। তবে আল্লাহর প্রতি দৃঢ় বিশ্বাসে কোনো কাজ করলে আল্লাহতায়ালাও বান্দাকে নিরাশ ও আশাহত করেন না। যার জ্বলন্ত প্রমাণ ইবরাহিম (আ.) এর কোরবানির ঘটনা।
সর্বাবস্থায় আল্লাহর হুকুমের সামনে মাথানত করা
আল্লাহর ইচ্ছা পালন থেকে বান্দার জীবনে বড় কোনো ইবাদত হতে পারে না। ইবরাহিম এবং ইসমাঈল দুই নবী সেটাই করে দেখিয়েছেন। বাবা-ছেলে কত শান্তভাবে আল্লাহর জন্য জীবন উৎসর্গের পরামর্শ করেছেন। ইবরাহিম (আ.) ছেলেকে বললেন, বৎস, আমি স্বপ্নে দেখেছি যে, তোমাকে জবেহ করছি, এখন তোমার অভিমত কী। সে বলল, পিতা, আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে তা সম্পন্ন করুন। (সুরা সাফফাত : ১০২)।
আল্লাহর হুকুমের সামনে কোরবানি করতে এবং কোরবান থেকে কেউ সামান্যতম কার্পণ্য করেনি। পিতা সন্তানের ভালোবাসাকে প্রশ্রয় দেয়নি।
ধৈর্য ধারণের শিক্ষা
ধৈর্য ধারণ করা মোমিনের গুণ। ইসমাঈলকে যখন আল্লাহর হুকুম কোরবানির কথা জানানো হয়েছিল, তখন তিনি প্রশান্ত চিত্তে উত্তর দিয়েছিলেন, আপনি আল্লাহ তাআলার হুকুম পালন করুন, ইনশাআল্লাহ! আমাকে ধৈর্যশীল পাবেন। (সুরা সাফফাত : ১০২)। তার এই উক্তি আমাদের সব ক্ষেত্রে ধৈর্যশীল হওয়ার শিক্ষায় উদ্বুদ্ধ করে।
অধীনদের আল্লাহর হুকুম পালনে আদেশ করা
কোরবানির ইতিহাস আমাদের শিক্ষা দেয় যে, আল্লাহর হুকুমের ব্যাপারে অধীনদের জানাতে হবে। হুকুম পালনে তাদেরকে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। যেমনটা ইবরাহিম (আ.) নিজ সন্তান ইসমাঈলকে করেছিলেন।
সামাজিক সাম্য ও পরামর্শের শিক্ষা
কোরবানি থেকে আমরা সমাজিক সাম্য ও পরামর্শের শিক্ষা পাই। ইবরাহিম (আ.) নিজ সন্তানের ওপর বিধান চাপিয়ে দেননি বরং তাকে আল্লাহর আদেশ সম্পর্কে জ্ঞাত করেছেন যে, আমি স্বপ্নে দেখেছি তোমাকে কোরবানি করতে, তোমার অভিমত কী? (সুরা সাফফাত : ১০২)।
উৎকৃষ্ট সম্পদ দান করা
কোরআনে আদম (আ.) এর ছেলেদের ব্যাপারে এসেছে, তাদের একজনের কোরবানি গৃহীত হয়েছিল। আর অন্যজনের গৃহীত হয়নি। (সুরা মায়েদাহ ২৭)। তাফসিরে তাবারিতে এসেছে, আদমের দুই ছেলের একজন বকরি পালতেন, অন্যজন কৃষিকাজ করতেন। বকরি পালনকারী পালের উৎকৃষ্ট বকরিটাকে কোরবানির জন্য নির্ধারণ করেন এবং আল্লাহ তার কোরবানি কবুল করেন। আর কৃষক আবাদের নিকৃষ্ট ফসলকে কোরবানির জন্য বাছাই করেন। যার কারণে তার কোরবানি কবুল হয়নি।
আদেশ পালনে অজুহাতের আশ্রয় না নেওয়া
ইবরাহিম (আ.) এর বিনাবাক্যে প্রিয় সন্তানকে জবেহ করা আমাদের শিক্ষা দেয় যে, আল্লাহ তাআলার আদেশের সামনে বান্দার কথা বলা অনুচিত। কোনো প্রকার অজুহাত ছাড়াই আল্লাহর আদেশ মেনে নেয়াই বান্দার জন্য কল্যাণকর। মূলত অজুহাত হলো, আদেশ অমান্য করারই একটি দিক। পিতা-পুত্র কেউ রবের আদেশে কোনো ধরনের প্রশ্ন তোলেননি। বিনা বাক্য ব্যয়ে মেনে নিয়েছেন আল্লাহ তাআলার বিধান। যার কারণে তারা সফলকাম হয়েছেন দুনিয়া এবং আখেরাতে।